Sunday, November 28, 2021

সাধারণ গৃহিনী থেকে ‘মহানায়িকা’, সুচিত্রা সেনের বাঁকা ঠোঁটের হাসিতে মজত লক্ষ লক্ষ পুরুষ

বাংলার ‘মহানায়িকা’ বলতে একজনকেই বোঝায়, তিনি হলেন ‘সুচিত্রা সেন।’ তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের একজন অন্যতম কিংবদন্তি। তার জায়গায় এখনো পর্যন্ত কোন অভিনেত্রী পৌঁছতে পারেনি। ষাটের দশকে তার সেই গ্ল্যামার, আকর্ষণীয় চোখ এবং অসাধারণ অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন হাজার হাজার দর্শকেরা। আজও বাঙালির মনে তার জন্য একটা বিশেষ জায়গা রয়েছে। তার সেই বাঁকা ঠোঁটের হাসি দেখলে আজও পুরুষ ভক্তদের মনটা যেন আবেগে ভরে যায়। যতদিন যাবে একের পর এক নায়িকা আসবে যাবে কিন্তু মহানায়িকা সুচিত্রা সেন থেকে যাবে বাঙালি মনের চিলেকোঠায়। বাঙালির আবেগের সাথে জুড়ে গেছেন তিনি।

কবি রজনীকান্ত সেনের নাতনি হলেন রমা সেন। এই রমা প্রথমে একবার স্বামীর সাথে সিনেমার ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলেন। প্রথম শব্দ উচ্চারনে এল নানা রকমের সমস্যা। প্রথমেই বাদ হয়ে যাচ্ছিলেন। তারপর নিজের জেদ আর অধ্যাবসায় বাংলা চলিত ভাষা শিখে পরের দিনই স্টুডিওতে পৌঁছালেন। এর পরেই ১৯৫১ সালে পরিচালক সুকুমার রায়ের সাথে প্রথম ‘১৯৫১ সালে সাত নম্বর কয়েদি’ সিনেমার তার আত্মপ্রকাশ ঘটলো। এরপর ১৯৫২ সালে স্বামীর সাথেই বাংলাদেশ ছেড়ে একেবারে পাকাপাকি ভাবে কলকাতায় চলে এলেন। তারপরেই টলিউডে ‘শেষ কথায়’ সিনেমাতে নায়িকারূপে ডেবিউ করলেন রমা। তবে এই সিনেমা কখনোই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি।

তবে অভিনয় প্রবেশের পর তিনি তার নাম পাল্টে হলেন অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন। এরপর ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে উত্তম কুমারের বিপরীতে প্রথম অভিনয় করলেন। এই সিনেমাতে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দর্শকদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলেন। তারপরে এই জুটি হয়ে গেল বাংলা সিনেমার সেরা জুটি। উত্তম-সুচিত্রা ছিল তখনকার চলচ্চিত্র জগতের এক আশীর্বাদ। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক আবার কখনো দাম্পত্য জীবনের গল্পে তারা হয়ে উঠেছিলেন অনবদ্য ও আকর্ষণীয়। তারপরে এক বছর পর ১৯৫৪ সালে পরপর ৯ টি ছবিতে সই করেছিলেন সুচিত্রা সেন।

এরপর ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত নিজের রূপ এর মাধ্যমে আর অভিনয় দক্ষতার দ্বারা একের পর এক হিট সিনেমা উপহার দিয়েছেন বাঙালি দর্শকদের। আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই সময় তিনি সাহসিনী নারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রচলিত গৃহবধূর ট্যাবু ভেঙে নিজেকে মহানায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন তিনি। আর তাই তিনি আজকেও সকলের প্রিয় মহানায়িকা। সেই সময় অভিনেত্রী কিন্তু শুধু শাড়িতেই থেমে থাকেননি। সেই সময় তাঁর ফ্যাশন স্টেটমেন্ট সেরার সেরা আইকনের তকমা পেয়েছিল।

যদিও সে সময় সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা মোবাইল ছিল না কিন্তু তার লাস্যময়ী ভঙ্গিতে শরীরে উন্মাদনার বিভিন্ন ধরনের ছবি তুলে বিভিন্ন পত্রিকার ম্যাগাজিনের পাবলিশ করা হতো। তিনি কখনো indo-western পোশাক তো কখনো আবার সাবেকিয়ানা সব সাজেতে একেবারে বাজিমাত করেছিলেন। কোন সময়ে মাথায় বড় হ্যাট পড়তেন আবার কখনো চোখে বড় সানগ্লাস দিয়েছেন। তার সেই রূপের কেউ ধারে কাছে পৌঁছাতে পারেনি। সেই সময় কোন বাঙালি অভিনেত্রী সুইম স্যুট পড়ে ছবি দেওয়ার সাহস করেননি কিন্তু সুচিত্রা সেন সেন সাহসিকতার সঙ্গে সেটিকে উপস্থাপনা করেছিলেন।

যদিও তিনি সেই কাজের জন্য সেইসময় ট্রোলের শিকার হননি। তবে এত সাফল্যের পরও হঠাৎ করেই তিনি একদিন নিজেকে নিজের অন্তর্ধানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও এর কারণ হিসেবে মনে করা হয় তার শেষ সিনেমা ‘প্রণয়পাশা’ ফ্লপ হয়েছিল। তখনই তিনি বুঝেছিলেন তার দিন শেষ। এরপর তিনি আর কোন সিনেমায় কাজ করেননি। জনসমক্ষে আসেননি। অনেকে অনেকরকম ভাবে চেষ্টা করেও তার আর কোনো ছবিও তুলতে পারেনি। তবে শুধুমাত্র একবার ক্যামেরার সামনে এসেছিলেন নিজের ভোটার কার্ডের ছবি তুলতে নিজের মেয়ের সাথে।

অভিনয় না করলেও তিনি আড়াল থেকে রামকৃষ্ণদেবের সেবায় ব্রতী হয়েছিলেন। এরপর ২০০৫ সালে ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারের জন্য সুচিত্রা সেনকে মনোনীত করা হয়েছিল, কিন্তু ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সশরীরে পুরস্কার নেওয়ার শর্ত ছিল। কিন্তু তিনি জনসমক্ষে আসবেন না বলে দিল্লী যাওয়ায় আপত্তি থাকার কারণে তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। এরপর ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি সকাল ৮ টা ২৫ মিনিট নাগাদ কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হয়েছিলেন ‘সেরার সেরা মহানায়িকা সুচিত্রা সেন।’

⚡ Trending News

আরও পড়ুন